রেইকি

বাইবেলের বর্ণনা থেকে জানা যায় হযরত ঈসা (আ.) তথা যিশুখৃস্ট শুধু স্পর্শ করেই রোগীকে সুস্থ করে দিতেন। অন্ধ ব্যাক্তি তাঁর স্পর্শে ফিরে পেতেন দৃষ্টি শক্তি, মৃতরা হতেন জীবিত। গৌতম বুদ্ধরও এধরনের আরোগ্য করণ ক্ষমতার কথা শোনা যায়। নবী রসুলসহ আরও অনেক মহামানব, পীর-ফকির, দরবেশ, মুনি, ঋষি, গির্জার যাজক, বৌদ্ধ ভিক্ষু বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক সাধক গণেরও তেমনি স্পর্শদ্বারা রুগ্ন ব্যাক্তিকে সুস্থ করে তোলার কথা প্রচলিত আছে। এ সবকিছুকেই এতদিন অলীক, অলৌকিক বলেই ব্যাখ্যা করা হতো। রেইকি চিকিৎসা সম্পর্কে জানার পর এখন মনে হয় এগুলি মোটেই অলৌকিক নয়। যিশু, বুদ্ধ, নবীগণ, অন্যান্য মহামানব, ফকির-দরবেশ, মুনি-ঋষিগণ যা করে ছিলেন তা হলো এক ধরনের রেইকি

উন্নত বিশ্বে রেইকি একটি স্বয়ং সম্পূর্ণ জাপানী বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির নাম। যাকে এক কথায় বলাহয় স্পর্শচিকিৎসা (Touch healing) । কেবলমাত্র দু-হাতের তালুর স্পর্শেই সকল রোগ সেরে যায়। সাধারণ ঠান্ডা লাগা থেকে ক্যান্সার পর্যন্ত- যে কোন রোগ, এনি ডিজিজ। সেটা দৈহিক বা মানসিক, আত্মিক, সাধারণ বা জটিল যাই হোক না কেন। কোন রকম ওষুধ বা রক্তক্ষরণ ছাড়াই রেইকি চিকিৎসা আপনাকে সুস্থ করে তোলে। শুধুমাত্র হাতের ছোয়ায় সহজ থেকে দূরারোগ্য সকল ব্যাধির আরোগ্য সাধন করে- মানুষের, গাছ-পালার, পশু-পাখীর, জীব-জন্তুর কিম্বা জড়বস্তুর।

কোন প্রকার ওষুধ, যন্ত্রপাতি, প্যাথলজিকাল টেষ্ট বা অপারেশান ছাড়াই রেইকি চিকিৎসা আপনকে সুস্থ করে তোলে। হাজার বছর আগে আমাদের উপমহাদেশে ঋকবেদ ও অথর্ববেদে যাকে প্রাণশক্তি বলা হয়েছে। রেইকি হলো সর্বব্যাপি জীব প্রাণশক্তি যার উপর জীবজড় নির্বিশেষে জন্মা অধিকার বিদ্যমান। এই সর্বব্যাপি শক্তি বা এনার্জি প্রয়োগ করার পদ্ধতি ইহলো রেইকি চিকিৎসা। একে বলা যায় প্রথাবিরুদ্ধ প্রচীনতম চিকিৎসা পদ্ধতির একটি আধুনিকতম সমাধান। যা বহুকাল আগে এ উপমহাদেশে চালু ছিল।

অদৃশ্য অনন্ত যে প্রাণশক্তি সৃষ্টির মূলে কৃয়াশীল রয়েছে, তারই সংহত বিশেষ প্রয়োগ স্পর্শের মাধ্যমে বা দূর থেকে রোগ নিরাময়ের প্রয়োজনে বিচ্ছুরিত করা হয়, তাই হল রেইকি চিকিৎসা। প্রবল মানসিক শক্তি, আত্মিক বশ ও শরীর স্থানের জ্ঞান রেইকি চর্চাকারীদের বিশেষ অবস্থানে উন্নীত করে।

আরো পরিস্কার করে বলা যায় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ তায়ালা যে শক্তি (নূর বা জ্যোতিঃ) বলে তাঁর সমগ্র সৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করেন, পরিচালনা করেন তারই নাম জাপানী ভাষায় রেইকি। মোট কথা রেইকি হলো বিশ্বব্যাপি সর্বাবস্থায় সর্বত্র বিরাজমান শক্তি বা কসমিক এনার্জির খেলা। কোয়ন্টাম পদার্থ বিদ্যায় যাকে গড পার্টিকেল বা ঈশ্বরকণা হিসাবে কল্পনা করেছিলেন বিজ্ঞানী ম্যাক্সপ্লাংক। একে একধাপ এগিয়ে দিয়েছিলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে বাঙ্গালী বিজ্ঞানী সত্যেন বোস। তাঁর সাথে যুক্ত হয়েছিলেন বিজ্ঞানী আইনস্টাইন। গবেষণার ধারাবহিকতায় বিশ্বের আরো বহু খ্যাতিমান বিজ্ঞানী এই গবেষণাকে সাফল্যোর পথে এগিয়ে নিয়েছেন। অতঃপর ইউরোপিয়ন অর্গানাইজেশান ফর নিউক্লিয়ার রিসার্স (সার্ন) এর বিজ্ঞানীরা কল্পনাকে বাস্তবরূপ দেয়া তথা ঈশ্বরকণা আবিস্কারের ঘোষণা দেন ২০১২ সালের মাঝা মাঝি সময়ে। আর এই ঐতিহাসিক সাফল্যের স্বীকৃতি মিলেছে ২০১৩সালে পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পুরস্কার লাভের ঘোষণার মাধ্যমে। ঈশ্বরকণা আবিস্কারের জন্য বৃটিশ বিজ্ঞানী পিটার হিগস্ ও বেলজিয়ামের বিজ্ঞানী ফ্রাঁসোয়া ইংলার্ট (বিস্তারিত জানতে রেইকি ও আধুনিক বিজ্ঞান শিরোনামে লেখকের নিবন্ধটি পড়ুন)।

রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস জানায়, পদার্থবিদ্যায় ২০১৩ সালে নোবেল পেয়েছেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পিটার হিগস ও বেলজিয়ামের ফ্রাঁসোয়া ইংলার্ট। ১৯৬০ এর দশকে এই দুই বিজ্ঞানীসহ একদল কণাতত্ত্ববিদ একটি মডেল প্রস্তাব করেন, যার মাধ্যমে পরমাণুর কিছু প্রাথমিক কণার ভরের উৎস ব্যাখ্যা করা হয়। ওই মডেলে  একটি কণার  কথা বলা হয়, যার নাম রাখা হয় পিটার হিগস ও বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যোন্দ্রনাথ বসুর নামে। তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যার এই মত অনুযায়ী, মহাবিশ্বের সবকিছুই ভর পেয়েছে এই হিগসবোসন কণার মাধ্যমে। একারণে এই কণার নাম হয়ে যায় ঈশ্বরকণা

তত্ত্বের সেই হিগস-বোসন কণা যে বাস্তবেও আছে- ২০১২ সালে তার প্রমাণ পাওয়া যায় ইউরোপের সার্ন গবেষণাগারে। জেনেভার কাছাকাছি ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের সীমান্তবর্তী ইউরোপীয় পরমাণু গবেষণা কেন্দ্র সার্নে লার্জ হ্যাড্রন কলাইডারে বিগ ব্যাংয়ের মিনি সংস্করণ সৃষ্টিকরে ঈশ্বরকণা পাওয়ার ঘোষণা দেন বিজ্ঞানীরা। রয়্যাল সুইডিশ অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের সেক্রেটারি স্তেফান নোরমার্ক এক বিবৃতিতে বলেন, বছরের পুরস্কার অতিক্ষুদ্র এক কণাকে নিয়ে, যা এই বিশ্বের সব পরিবর্তনের মূলে।

 

রেইকি আসলে কি

রেইকি (REIKI) একটি জাপানী শব্দবন্ধ। ‘রেই’‘কি’ এই দুটি শব্দের সহ যোগে জাপানি শব্দযুগল রেই-কি তৈরি। ইংরেজী হরফে REI-KI। REI- শব্দের ইংরেজী অর্থ হলো ইউনিভার্সাল বা কসমিক। বাংলায় মহাজাগতিক, আধ্যাত্মিক, সর্বোচ্চশক্তি। আর KI- শব্দের অর্থ ভাইটাল লাইফ ফোর্স এনার্জি বা সঞ্জীবনী প্রাণশক্তি বা জীবনী শক্তি। সব মিলিয়ে মানে দাঁড়ায় কসমিক এনার্জি বা মহাজাগতিক প্রাণশক্তি বা আধ্যাত্মিক শক্তি। এক কথায় সর্বব্যাপী প্রাণশক্তি।

Rei-      Universal, Cosmic, Spiritual, Godly, God’s Wisdom or the Higher Power.

Kei-      Energy, Vital Force, Life force energy, Prana, Urza.

Reiki-   Spiritually guided life force energy.

স্বয়ংসম্পূর্ন চিকিৎসা পদ্ধতি রেইকিকে মুসলিম দেশে সমূহে বলা হয় ‘নুর-এ-ইলাহী’ বা মহা প্রভূ আল্লাহর নূর/ জ্যোতিঃ/ আলো, কোথাও কোথাও বার্ক বা বর্ক। ভারতীয়রা একে মহাজাগতিক প্রাণশক্তি বা প্রাণ বলে থাকে। আমেরিকায় ইউনিভার্সাল লাইফফোর্স এনার্জি বা কসমিক এনার্জি, রাশিয়ায় বায়ো প্লাজমিক এনার্জি, চীনে তাইচি সংক্ষেপে চি। আর জাপানে রেইকি। আধুনিক বিজ্ঞানের শাখা কসমো লজির ভাষায় ঈশ্বরকণা বা হিগস-বোসান

স্পর্শচিকিৎসা

রেইকি প্রয়োগের সময় Tuch বা স্পর্শের মাধ্যমে কসমিক এনার্জি শরীরে প্রবেশ করিয়ে সকল রোগ ব্যাধির চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। একজন রেইকি চ্যানেল এই কসমিক এনার্জি অ্যাবজর্ব করেন তাঁর শরীরের বিভিন্ন শক্তি চক্র বা লতিফা বা এন্ডোক্রিন গ্রন্থির মাধ্যমে। এই এনার্জি হাতের মাধ্যমে বাহিত হয়ে স্পর্শের মাধ্যমে নিজের বা অন্যের শরীরে অথবা যে কোন বস্তুতে সঞ্চারিত করা হয়। অর্থাৎ কসমিক এনার্জি হাতের তালুর মাধ্যমে দেহের অসুস্থ জায়গায় প্রবেশ করিয়ে দিয়ে সুস্থ করে তোলার প্রকৃয়া ও পদ্ধতি। এতে শুধু হাতের দুই তালুর ছোঁয়ায় রোগ নিরাময় সম্ভব হয়। তাই রেইকিকে বলা হয় হস্তস্পর্শ চিকিৎসা বিদ্যা বা স্পর্শচিকিৎসা বা Tuch healing.

এনার্জি থেরাফি/ হিলিং

মানব দেহে আছে সাতটি প্রধান শক্তিচক্র বা এনার্জি সেন্টার। কসমস বা মহাজগৎ থেকে এই প্রধান সাতটি চক্রে শক্তি প্রবাহিত হয়। আমরা যে সুস্থ থাকি তার কারণ হল মুখ্য সাতটি এন্ডোক্রাইন বা অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতে অবিরাম শক্তি প্রবাহ Continuous flow of Energy. এই প্রাণশক্তি বা এনার্জি শরীরের সাতটি এন্ডোক্রাইন গ্রন্থি অথাৎ লতিফা বা চক্র নিরন্তর আহরণ করে থাকে।

যখন কোন চক্র বা সংশ্লিষ্ট এন্ডোক্রাইন গ্রন্থিতে কোন কারণে কসমিক এনার্জির প্রবাহ বাধা গ্রস্থ হয়, তখন সেই গ্রন্থি প্রাণশক্তির অভাবে সাময়িক ভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। ফলে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থির সাথে যুক্ত অঙ্গ প্রত্যাঙ্গ সমূহ সাময়িক ভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন রেইকি বা মহাজাগতিক প্রাণশক্তির প্রবাহ দিলে বা প্রয়োগ করলে অসুস্থতা দূরহয়ে যায়।

মহাজাগতিক শক্তি তথা কসমিক এনার্জির প্রবাহের মাধ্যমে এই চিকিৎসা সম্পন্ন হয় বিধায় পাশ্চাত্যে এই প্রকৃয়াকে এনার্জি থেরাফি, এনার্জি মেডিসিন বা এনার্জি হিলিংও বলা হয়ে থাকে।

শক্তি তরঙ্গ বা শক্তির প্রবাহ

রেইকি তড়িৎ প্রবাহ নয়, রেডিয়াম বা রঞ্জন রশ্মি ও নয়, এটা রেডিও তরঙ্গের ন্যায় এক মহাজাগতিক শক্তি তরঙ্গ। বিদ্যুৎ চুম্বকীয় তরঙ্গ। ইহা দ্বারা স্পর্শচিকিৎসা বা ইহাকে ক্ষুদ্র তরঙ্গাকারে প্রেরণ করে রোগীর সাথে দূরত্বের ব্যবধানেও চিকিৎসা করা সম্ভব। ইহা রেশম বস্ত্রের সূক্ষ আবরণ, লিনেন, প্লাষ্টিক, পোরসেলিন, দস্তা, কাঠ কিংবা স্টীল, সীসা, পাহাড়, পর্বত, আগুণ, পানি সবকিছু ভেদ করে যেতে পারে; কারণ ইহা এক অপরিমেয় শক্তির প্রবাহ।

রেইকি শক্তি শিশু, যুবক বা বৃদ্ধ নির্বিশেষে প্রবাহিত হয়। যখন কেউ একে গ্রহণ করতে ইচ্ছা করে। রেইকি নিজেই পথ দেখায়। এক পবিত্র আয়োজনের মধ্যে দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। যেহেতু ইহা ঐশ্বরিক শক্তি– এর মধ্যে কোন ভুল ভ্রান্তির সম্ভাবনা নেই। নেই কোন দুশ্চিন্তা। কেউ এই শক্তি দ্বারা দীক্ষিত হওয়ার পর যখন তার হাতদিয়ে কোন রোগীর রোগাক্রান্ত স্থানে স্পর্শ করে, তখন এই শক্তি তরঙ্গ প্রবাহিত হয় হাতের মাধ্যমেই। ইহা বেদনা দূরীভূত করে। রক্তক্ষরণ বন্ধ করে। মানুষকে গভীর নিদ্রামগ্ন হতে সাহায্য করে। মনে হয় যেন তাকে শুধু প্রয়োগ করে অজ্ঞান করা হয়েছে। ইহা মহাজাগতিক শক্তি, কারণ ইহা যে তরঙ্গে বিচরণ করে তা মানুষকে দেয় অপরিমেয় আনন্দ, তাকে করে নির্বেদ দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী।